" /> শূন্য মন্দির মোর – সুন্দরবন সাহিত্য সংসদ
Home / ছোট গল্প / শূন্য মন্দির মোর

শূন্য মন্দির মোর

ডি. হুসাইন 

শরতের বৃষ্টিস্নাত সকাল ।  ঘুমের জন্য যুতসই একটা আবহাওয়া ।  অন্যদিন সকাল ছয়-সাতটা নাগাদ রোদ উঠে যায় ।  রোদের তেজও থাকে গা জ্বালানো । প্রজাপতি পরিবহনে জানালার পাশের সিটে বসেছে অয়ন । গাড়ি চলছে হেলেদুলে, হক্কর ঝক্কর শব্দে । বৃষ্টির ঝাপটা লেগে জানালার কাঁচগুলো আবছা হয়ে আছে ।  বৃষ্টি কমে আসতেই জানালার কাঁচ সরিয়ে একটু সতেজ বাতাস  নিতে চায় সে ।  পরীক্ষার জন্য  তার এই কয়েকটা দিন কেটেছে চরম ব্যস্ততায় । রোড ডি-ভাইডারে লাগানো কাঠগোলাপের গাছগুলো যেন সবুজের দ্যুতি ছড়াচ্ছে । অন্য সময় ধুলোয় ধূসর হয়ে থাকা সবুজ পাতাগুলো । কতগুলো আকাশচূড়া ফুল রাস্তায় পড়ছে আর যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে  । অয়নের মনে হয় ;  শরতের বৃষ্টির তাল, লয়, ছন্দ বর্ষার বৃষ্টির চেয়ে যেন  ভিন্ন । হঠাৎ ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ির দঙ্গল আটকে যায় । বৃষ্টি আবার পড়তে শুরু করে ।   জানালটা ভিজিয়ে দেয় অয়ন । অবছা জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে, তার বাসের গা ঘেঁষেই একটা বাস দাঁড়িয়ে ।  পাশের বাসটার জানালার কাছে বসা এক রূপসী তরুণী । জানালা খুলে হাত বাড়ালেই ধরা যাবে এমন কাছাকাছি মেয়েটা ।  অস্বচ্ছ জানালা দিয়ে তাকিয়েই মেয়েটির একটা মোহনীয় রূপ এঁকে ফেলে অয়ন । গাঢ় নীল শাড়ি পরা, ঠোঁটে কড়া লাল লিপিস্টক, খোলতাই গঠন ।  আহা !  নীল পরী আমার । অয়ন মেয়েটার মায়ায় পরে যায় ।  এই একটা সমস্যা ইদানিং জ্বালাচ্ছে অয়নকে ।  কোন সুন্দরী মেয়ে দেখলেই প্রেমে হাবুডুবু  খায় । আবেগ উছলে উঠে  । আবার ঘোর কাটতেও বেশিক্ষণ সময় লাগে না তার । এবার সিগন্যাল ছাড়ে । গাড়িগুলোর ঘোঁ… ঘোঁ… পি… পি… শব্দ করে এগোয় । অয়ন থাকে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে । কয়েকজন বন্ধু মিলে ফ্লাট ভাড়া নিয়ে ।  অয়নের গন্তব্যে বসিলা । তার চাচাতো ভাই থাকে সেখানে ।  কয়েদিন ধরেই আসবো আসবো করে আসা হয়নি তার । অয়নের ফোনের রিংটন বেজেউঠে ।  স্কিনে লেখা ইনকামিল কল । বাবা।  রিসিভ করেই সালাম জানায় অয়ন । ওপাশ থেকে কৌতূহলী কন্ঠে অয়নের বাবা প্রশ্ন করে– : কিরে ব্যটা, তোর মামা’ক দেখবা যাঁচি নাকি,  বাপ ? : হ, যাঁচু আব্বা ৷ এই তো বাসত আঁছু । : ঠিক ছে । যা তাহলে পরে ফোন দিম । ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে দেয় অয়নের বাবা । হেডফোনটা কানে গুঁজে এফ এম রেডিও অন করে অয়ন ।  সুকন্ঠী আরজের কন্ঠ ; Hi dear listener .  চলুন শুনি আসি এই বৃষ্টিস্নাত শরতের রোমান্টিক সকালে রবীন্দ্রনাথের একটি চমৎকার গান ।  সাথেই থাকুন । ফিরছি একটু পরেই । বেজে ওঠে  গান –“এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর এ ভরা বাদর মাহ বাদর শূন্য মন্দির মোর… ।,,বসিলা বাসস্ট্যান্ড থেকে দুই তিন মিনিট হাঁটার পথ ৷ বাস থেকে নেমেই কাঁদা-পানি এড়িয়ে  হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকে ।  দরজার কাছে এসে কলিংবেল চাপ দিতই ভাতিজি তিতলীদরজা খুলে দেয় । অয়নকে দেখেই সে এক চিৎকার দিয়ে জানান দেয় অয়নচ্চু এসেছে….! মা মা, বাবা বাবা, নানী অয়নচ্চু এসেছে । আহ্লাদিত গলায় কথার খই ফুটে ৫ বছর বয়সী তিতলীর । তার চাচাতো ভাই কামাল তাকে বসতে দিয়ে বলল : বাব্বাঃ, তুই ওসলো তাহলে ।  এত্তেদিন পর ।  কেমন ছুয়া তি রে হা ! বয়সে প্রায় দশবছরের বড় অয়নের চাচাতো ভাই একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে ।  একটা মেয়ে নিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রীর ছোট্ট সংসার ।  ড্রয়িং রুমে উঁকি দিয়ে দেখে ছোটখাট একটা মিটিং বসেছে ।  মিটিংয়ের মধ্যমণি যে ছোট মামি তা দেখেই আন্দাজ করা যায় ।ছোট মামী অয়নের চাসতো মামি ।  ঠাকুরগাঁওয়ের যৌথ পরিবারগুলোতে চাচাতো মামি – খালা-ফুফু সবাই মিলে এক পরিবার !  আত্মীয়তার একেকটা মহীরুহ উদাহরণ ঠাকুরগাঁও জেলার যৌথ পরিবারগুলো । এখনো এমন অনেক পরিবার দেখা যায় । অয়ন লক্ষ করে,  সবার মুখে  বিষাদের ছায়া ।  তিতলী ছাড়া সবার মুখে চিন্তার  আশঙ্কার কালো মেঘ ।  সোফায় বসতেই নাস্তার পিরিচটা দেখে প্রথম বারের মত সঙ্কোচে পড়ে অয়ন ।  পিরিচে আপেল, কমলা, নাসপাতি ।  তাই দেখে তার মনে হল — রোগী দেখতে এসেছি, কিছু ফলমূল নিয়ে আসা তো উচিত ছিল !  যদিও রোগী আহমদ বাসির মামা বর্তমানে খাবার গ্রহনের মত পরিস্থিতিতে নেই ।  তবুও নিয়ে আসাই তো সৌজন্যতা । মাইমুনা মামি ।  যাকে ওরা সবাই ছোট মামি বলে ডাকে , তার দিকে তাকিয়ে অয়নের মনটাও কেমন খারাপ হয়ে যায় মুহুর্তে ।  ঈদের ছুটিতে যখন অয়ন বাড়ি গিয়েছিল তখনকার দেখা সেই প্রাণবন্ত, রসিক, হাস্যোজ্জ্বল ছোট মামি যেন কতকাল হাসেননি ।  আরেক কাজিনের বিয়েতে গীত গেয়ে কি আসর’ই না  মাতিয়েছিলেন তিনি  –” কেনে কান্দিচেন কইনাগে, হামার ভিতি দেখেছোট হাতে কইছিনু কইনাগে, নবাবের চাকিরি সেইখানে রাখিছিনু কইনাগে,  বক বক দাড়ি । দিনাজপুর শহরে কইনাগে, নাপিত মাংগাইম, কামায়ে ফেলাম কইনাগে, হাউসের দাড়ি…।ঠাকুরগাঁওয়ের লোকজ ভাষার গীত, প্রবাদ, ছড়া ছোট মামীর ঠোঁটস্থ !  রানীশংকৈল বন্দরের প্রতিবেশী কারোর বিয়ে কিংবা আত্মীয় স্বজনের বিয়েতে গীত গাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেননা তিনি । হেলেদুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে কয়কজন সমবয়সী মহিলার ঘাড় ধরে সেই কি গীত !সেই ছোট মামির আজ কি পান্ডুর আর রুক্ষ রূপ  ।   কান্নার আওয়াজ শুনে সম্বিত ফিরে পায় অয়ন ।  মামি কেমন শুর করে ছন্দে ছন্দে কাঁদছে —“সব শেষ হয়ে গেইল গে বাবু….।মোক পানি’ত ভাসাহেনে তি মরবা বসিয়ি গে যাদু…।,, কামাল ভাইয়ের হায়েজে করে সবাই  পান্থপথের স্কোয়ার হাসপাতালে পৌঁছায় তারা ।  অয়ন আই.সি.ইউতে থাকা বাসির মামাকে দেখতে কাঁচের জানালার পাশে দাঁড়ায় ।  ডাক্তার আগেই বলে দিয়েছিল অবস্থা সিরিয়াস ।  হার্টের অপারেশনের পর রোগী বাঁচতেও পারে নাও বাঁচতে পারে । রিস্ক আছে ।  কাল জানিয়েছ রোগীর হার্টরেট কমছে ৷  মানে আস্তে আস্তে করে  মারা যাচ্ছা মামা ।  কি ভয়ংকর একটা অবস্থা ! অয়ন লক্ষ করে মামার মুখে অক্সিজেন মাউস লাগানো, কতগুলো নল বুকে, পিঠে লাগানো ।  আর দেখতে পারে না সে ৷ আই. সি.ইউর সামনে বসানো সারি সারি চেয়ারের শেষের একটাতে বসে অয়ন । চেয়ারে বসে কতক্ষণ ফেইসবুকিং করে । হেডফোনটা কানে গুঁজে পিঠ এলিয়ে দেয় । এসির বাতাসে তন্দ্রা এসে যায় তার । অয়ন দেখে — সে ছোট মামির বাড়িতে বেড়াতে এসেছে ।  বাসির মামা স্বভাবসুলভ একগাল হেসে বলছে– এতদিন পরে আসলেন বারে ?  তোমার বাড়িত সবাই ভাল ছে ত না । তোমার আব্বা আম্মার কি খবর ? মামার কন্ঠস্বর মিউট হয়ে যায় । মামার পিছনে গাড় নীল শাড়ি পড়া কে যেন মৃদু পা’য়ে হেঁটে আসে ।  কেমন মোহনীয় পরাবস্তব আবয়ব মেয়েটার ।  অনেকটা ছোট মামির মত দেখতে ।  কেমন চেনা চেনা মনে হয় ।  মাথাটা যেন হাজার মন ভারি  ।  হঠাৎ আর্তনাদ শুনে তন্দ্রা ভাঙে অয়নের । এইটুক ঝিমুনিতেই যেন কতবছর কাটিয়ে আসে অয়ন ।  অদ্ভুত ।  এফ এমে এখনো ঐ গানটা বাজছে— “এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর এ ভরা বাদর মাহ বাদর শূন্য মন্দির মোর ।,,এদিকে ছোট মামির কান্নার গমক বাড়তে থাকে  ।  স্ট্রেচার কাপড় আবৃত কার লাশ নিয়ে যাচ্ছে নার্সরা ? কেমন যেন একা একা লাগছে অয়নের । হে শূন্য মন্দির মোর । 

About sbsahitya

Check Also

আমাদের হলদে বাড়ি

রাজিত ফারহান  আমাদের বাসাটা রঙ করা হয়না প্রায় ২০ বছর যাবত। বাসাটা যদিও বেশী বড় ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »

xu hướng thời trangPhunuso.vnshop giày nữgiày lười nữgiày thể thao nữthời trang f5Responsive WordPress Themenha cap 4 nong thongiay cao gotgiay nu 2015mau biet thu deptoc dephouse beautifulgiay the thao nugiay luoi nutạp chí phụ nữhardware resourcesshop giày lườithời trang nam hàn quốcgiày hàn quốcgiày nam 2015shop giày onlineáo sơ mi hàn quốcshop thời trang nam nữdiễn đàn người tiêu dùngdiễn đàn thời tranggiày thể thao nữ hcmphụ kiện thời trang giá rẻ

Skip to toolbar